জমি কেনার আগে প্রয়োজনীয় ৫টি আইনি ও কাগজপত্র সংক্রান্ত সতর্কতা
জমি-সংক্রান্ত মামলার বড় অংশই শুরু হয় কেনার আগে কয়েকটি সাধারণ যাচাই বাদ পড়ার কারণে। টাকা পরিশোধের আগে নিচের পাঁচটি ধাপ শেষ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। প্রতিটি ধাপেই কাগজের ফটোকপি নয়, মূল বা সার্টিফাইড কপি দেখতে চাওয়াই নিয়ম।
১. মালিকানার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখুন
বিক্রেতা জমিটি কীভাবে পেলেন, তার প্রমাণ থাকতে হবে। কিনে থাকলে তাঁর ক্রয় দলিল, উত্তরাধিকার সূত্রে পেলে ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টননামা। এর সঙ্গে আগের মালিকদের দলিল অর্থাৎ বায়া দলিলগুলোও দেখতে হবে, সাধারণত অন্তত কয়েক ধাপ পিছিয়ে। কোনো এক ধাপের দলিল অনুপস্থিত থাকলে সেখানেই ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। দলিলের নম্বর ও তারিখ ধরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফাইড কপি তুলে মিলিয়ে দেখা যায় — জাল দলিল ধরার সবচেয়ে কার্যকর উপায় এটিই।
২. খতিয়ান, দাগ ও পরিমাণ যাচাই করুন
দলিলে লেখা মৌজা, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বরের সঙ্গে সর্বশেষ খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখুন। বিক্রেতার হিস্যা অনুযায়ী তিনি প্রকৃতপক্ষে কত জমির মালিক, সেই হিসাব করে নিন। মৌজা নকশা সংগ্রহ করে দাগের অবস্থান বুঝে নিলে পরে সীমানা নিয়ে বিভ্রান্তি কমে। বিস্তারিত পদ্ধতি খতিয়ান চেনার গাইডে দেওয়া আছে।
৩. দায়মুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হোন
জমিটি ব্যাংকে বন্ধক আছে কি না, কারও অনুকূলে বায়নানামা করা আছে কি না, কিংবা জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে কি না — এগুলো জানা অপরিহার্য। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তল্লাশি দিয়ে ওই জমির নামে সম্পাদিত দলিলের তালিকা ও নির্দায় সনদ (Non-encumbrance Certificate) সংগ্রহ করা যায়। পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি অফিসে খোঁজ নিন জমিটি খাসজমি, অর্পিত সম্পত্তি, সরকারি অধিগ্রহণের তালিকাভুক্ত বা পরিবেশগতভাবে সংরক্ষিত কোনো শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত কি না।
৪. সরেজমিন দখল ও সীমানা দেখুন
কাগজে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে জমিটি অন্য কারও দখলে থাকতে পারে, কিংবা রাস্তা, খাল বা প্রতিবেশীর ঘর জমির অংশ ছুঁয়ে থাকতে পারে। একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমিন দিয়ে জমি মাপিয়ে চারপাশের চৌহদ্দি মিলিয়ে নিন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলুন — স্থানীয়ভাবে জমি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে সেটি সাধারণত এখান থেকেই জানা যায়। জমিতে যাতায়াতের বৈধ রাস্তা আছে কি না, তা-ও আগে থেকে নিশ্চিত করুন।
৫. খাজনা, কর ও বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করুন
হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ দেখতে চান; বকেয়া থাকলে তা কে পরিশোধ করবে, তা আগেই ঠিক করে নিন। বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের তথ্য দলিল ও খতিয়ানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। বিক্রেতা যদি প্রতিনিধির মাধ্যমে দলিল করেন, তবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিটি বৈধভাবে রেজিস্ট্রিকৃত ও বাতিল হয়নি — তা নিশ্চিত হতে হবে। একাধিক শরিক থাকলে প্রত্যেকের সম্মতি ও স্বাক্ষর প্রয়োজন; অপ্রাপ্তবয়স্ক শরিক থাকলে আদালতের অনুমতি লাগে।
প্রবাসীদের জন্য বাড়তি সতর্কতা: দূর থেকে জমি কেনায় ঝুঁকি বেশি। টাকা পাঠানোর আগে কাগজের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে একজন আইনজীবীকে দিয়ে যাচাই করান, জমির সাম্প্রতিক ভিডিও ও ছবি নিন, এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিধি সুনির্দিষ্টভাবে সীমিত রাখুন। সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করুন, যাতে অর্থ পরিশোধের প্রমাণ থাকে।
টাকা পরিশোধের নিরাপদ পদ্ধতি
বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন এড়িয়ে চলুন। পে-অর্ডার, চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করলে প্রমাণ থাকে এবং পরে বিরোধ হলে তা কাজে লাগে। বায়নার টাকা দেওয়ার সময় রেজিস্ট্রিকৃত বায়নানামা করে নিন, যাতে নির্দিষ্ট সময়, মূল্য ও শর্ত লেখা থাকে। চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধ করুন দলিল সম্পাদনের দিন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই — এর আগে নয়।
শেষ কথা হলো, তাড়াহুড়ো জমি কেনার সবচেয়ে বড় শত্রু। "অন্য ক্রেতা আছে, আজই টাকা দিতে হবে" — এই চাপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যাচাই এড়ানোর কৌশল। কাগজ যাচাইয়ে যে কয়েক হাজার টাকা ও কয়েক সপ্তাহ খরচ হয়, তা ভবিষ্যতের বছরের পর বছরের মামলার তুলনায় নগণ্য।