Jomi Porimap BDডিজিটাল ভূমি সেবা ও পরিমাপ নির্দেশিকা

দলিল রেজিস্ট্রি খরচ ২০২৬: স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্থানীয় করের হিসাব

দলিল ও রেজিস্ট্রেশন · পড়তে সময় লাগবে আনুমানিক ১০ মিনিট
লেখক: Jomi Porimap BD সম্পাদকীয় দল · প্রকাশ ও হালনাগাদ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · সম্পাদকীয় নীতি

জমি কেনার সময় শুধু জমির দামই বড় খরচ নয়। দলিল রেজিস্ট্রির সময় স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর এবং কিছু নির্দিষ্ট ফি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক যোগ হয়। আগে থেকে এই হিসাব জানা না থাকলে শেষ মুহূর্তে টাকার সংস্থান নিয়ে বিপদে পড়তে হয়। এই গাইডে খরচের প্রতিটি খাত আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হলো।

খরচের ভিত্তি কী — বাজারদর না মৌজা রেট

রেজিস্ট্রেশনের খরচ হিসাব হয় দলিলে লেখা মূল্যের উপর, তবে সেই মূল্য সরকার-নির্ধারিত সর্বনিম্ন মৌজা রেটের নিচে হতে পারে না। প্রতিটি মৌজার জন্য জমির শ্রেণি অনুযায়ী সর্বনিম্ন দর নির্ধারিত থাকে এবং তা নির্দিষ্ট সময় পরপর হালনাগাদ হয়। বাস্তব বিক্রয়মূল্য মৌজা রেটের চেয়ে বেশি হলে প্রকৃত মূল্যই দলিলে লেখা উচিত — কম দেখিয়ে কর বাঁচানোর চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে সম্পত্তি বিক্রির সময় মূলধনি লাভে বেশি কর দিতে হয়, আর ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও জমির মূল্যায়ন কম দেখায়।

প্রধান খরচের খাতগুলো

স্ট্যাম্প ডিউটি
দলিল মূল্যের উপর শতকরা হারে ধার্য। সাধারণ কবলা দলিলের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত হার দলিল মূল্যের ১.৫ শতাংশ।
রেজিস্ট্রেশন ফি
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ফি, সাধারণত দলিল মূল্যের ১ শতাংশ।
স্থানীয় সরকার কর
সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ধার্য কর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের ৩ শতাংশ ধরা হয়; এলাকাভেদে হার ভিন্ন হতে পারে।
উৎসে কর (গেইন ট্যাক্স)
বিক্রেতার আয়ের বিপরীতে অগ্রিম আয়কর, যা রেজিস্ট্রির সময়ই আদায় হয়। এলাকা ও জমির অবস্থানভেদে হার আলাদা — অভিজাত ও বাণিজ্যিক এলাকায় বেশি, গ্রামীণ এলাকায় কম। কিছু এলাকায় কাঠা বা শতক প্রতি নির্দিষ্ট অঙ্ক ও শতকরা হারের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি প্রযোজ্য হয়।
নির্দিষ্ট ফি
ই-ফি, এন-ফি (নকলনবিশ ফি), এনএন ফি, হলফনামা, স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি ইত্যাদি। এগুলো তুলনামূলক ছোট অঙ্ক, তবে দলিলের পৃষ্ঠা ও শব্দসংখ্যার উপর নির্ভর করে কিছুটা বাড়ে-কমে।

গুরুত্বপূর্ণ: স্ট্যাম্প ডিউটি, ফি ও করের হার সরকারি প্রজ্ঞাপন, অর্থ আইন এবং স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। এখানে দেওয়া হার ও হিসাব প্রাথমিক ধারণার জন্য। চূড়ান্ত অঙ্ক জানতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা একজন দলিল লেখক/আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।

একটি নমুনা হিসাব

ধরা যাক একটি পৌরসভা এলাকায় ৫ শতক জমির দলিল মূল্য ২০,০০,০০০ টাকা। তাহলে প্রধান খাতগুলোর হিসাব দাঁড়ায় — স্ট্যাম্প ডিউটি ১.৫% হিসেবে ৩০,০০০ টাকা, রেজিস্ট্রেশন ফি ১% হিসেবে ২০,০০০ টাকা এবং স্থানীয় সরকার কর ৩% হিসেবে ৬০,০০০ টাকা। উৎসে কর ৪% ধরলে আরও ৮০,০০০ টাকা যুক্ত হয়। সঙ্গে নির্দিষ্ট ফি বাবদ কয়েক হাজার টাকা মিলিয়ে মোট খরচ প্রায় ১,৯৫,০০০ টাকার কাছাকাছি হয়, অর্থাৎ জমির দামের প্রায় ৯.৫ শতাংশ। নিজের ক্ষেত্রে হিসাব মিলিয়ে দেখতে রেজিস্ট্রি খরচ পাতার হিসাবযন্ত্রটি ব্যবহার করুন।

কে কোন খরচ বহন করে

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্থানীয় কর ক্রেতা বহন করেন, আর উৎসে কর বিক্রেতার আয়ের বিপরীতে ধার্য হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাই তা পরিশোধ করে থাকেন। এটি আইন নয়, বরং দরকষাকষির বিষয় — তাই বায়নানামা করার সময়ই কে কোন খরচ দেবেন তা লিখিতভাবে ঠিক করে নেওয়া উচিত। মৌখিক সমঝোতার উপর ভরসা করলে রেজিস্ট্রির দিন বিরোধ বাধে।

দলিলের ধরন অনুযায়ী পার্থক্য

  • সাফ কবলা: সাধারণ বিক্রয় দলিল; উপরের পূর্ণ হার প্রযোজ্য।
  • হেবা ও হেবা-বিল-এওয়াজ: নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের মধ্যে দান-হস্তান্তরে বিশেষ ছাড় ও নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য হয়, যা সাধারণ কবলার চেয়ে অনেক কম।
  • বণ্টননামা: শরিকদের মধ্যে জমি ভাগের দলিল; জমির মূল্য অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ফি লাগে।
  • বায়নানামা: বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতিপত্র। এটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক, নইলে আইনি সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: বিশেষত প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; বিদেশ থেকে সম্পাদন করলে দূতাবাসে সত্যায়ন ও দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

রেজিস্ট্রির দিনের প্রস্তুতি

দলিল সম্পাদনের দিন ক্রেতা, বিক্রেতা ও সাক্ষীদের সশরীরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। সঙ্গে থাকতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, টিআইএন সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), বিক্রেতার মালিকানার কাগজপত্র ও হালনাগাদ খাজনার রসিদ। দলিলে জমির চৌহদ্দি, দাগ নম্বর ও পরিমাণ নিজে পড়ে মিলিয়ে নিন — স্বাক্ষরের পর সংশোধন করতে হলে আলাদা সংশোধনী দলিল লাগে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল ফেরত পেতে কিছু সময় লাগে; ইতিমধ্যে রসিদটি যত্নে রাখুন। মূল দলিল হাতে পাওয়ার পর দেরি না করে নামজারির আবেদন করুন, কারণ নামজারি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি রেকর্ডে জমি আপনার নামে হয় না।