জমির নামজারি বা ই-নামজারি (Mutation) করার নিয়ম ও খরচ
দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলেই জমির মালিকানা সরকারি খাতায় আপনার নামে চলে আসে না। রেজিস্ট্রি বলে হস্তান্তরটি হয়েছে; কিন্তু সরকারি রেকর্ডে বিক্রেতার নাম কেটে আপনার নাম বসানোর কাজটির নাম নামজারি বা মিউটেশন। নামজারি না করালে খাজনা দেওয়া যায় না, জমি আবার বিক্রি করা কঠিন হয়, ব্যাংক ঋণে জমি বন্ধক রাখা যায় না এবং ভবিষ্যতে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতেও সমস্যা হয়।
কখন নামজারি করতে হয়
- কবলা, হেবা, দানপত্র বা যেকোনো দলিলের মাধ্যমে জমি কেনার পর।
- উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর — এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টননামা লাগে।
- নিলাম, আদালতের ডিক্রি বা সরকারি বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমি পেলে।
- যৌথ জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান খোলার প্রয়োজন হলে।
অনলাইনে আবেদনের ধাপ
- নিবন্ধন: ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি সেবায় মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। প্রবাসীরা পাসপোর্ট তথ্য ব্যবহার করে আবেদন করতে পারেন।
- আবেদন ফরম পূরণ: বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ নির্ভুলভাবে লিখুন। এখানে ভুল হলে পরে শুনানিতে সময় নষ্ট হয়।
- কাগজপত্র আপলোড: স্ক্যান করা কপি পরিষ্কার ও নির্ধারিত আকারের মধ্যে হতে হবে।
- আবেদন ফি পরিশোধ: মোবাইল ব্যাংকিং বা কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে ফি দিয়ে আবেদন জমা দিন এবং ট্র্যাকিং নম্বর সংরক্ষণ করুন।
- শুনানি: সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে নির্ধারিত তারিখে শুনানির নোটিশ আসে। মূল কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রয়োজনে প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি লাগে।
- সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদন: ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জমি ও কাগজ যাচাই করে প্রতিবেদন দেন।
- অনুমোদন ও DCR: আবেদন মঞ্জুর হলে বাকি ফি পরিশোধ করে DCR (Duplicate Carbon Receipt) ও নতুন খতিয়ান সংগ্রহ করতে হয়।
যেসব কাগজপত্র লাগে
- মূল দলিলের সার্টিফাইড বা সত্যায়িত কপি।
- বায়া দলিল অর্থাৎ আগের মালিকানার ধারাবাহিক দলিলসমূহ।
- সর্বশেষ খতিয়ানের কপি (RS বা BS, যা প্রযোজ্য)।
- হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনার রসিদ।
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
- উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ ও বণ্টননামা।
সরকারি ফি কত
নামজারির সরকারি ফি নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক কম। সাধারণভাবে যে খাতগুলোতে টাকা দিতে হয়:
| খাত | টাকা |
|---|---|
| আবেদন ফি (কোর্ট ফি) | ২০ |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ |
| রেকর্ড সংশোধন ফি | ১,০০০ |
| প্রতি খতিয়ান সরবরাহ ফি | ১০০ |
| মোট | ১,১৭০ |
এর বাইরে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর থাকলে তা পরিশোধ করতে হয়। কোনো দালাল বা তৃতীয় পক্ষ এর চেয়ে বেশি টাকা দাবি করলে বুঝতে হবে সেটি সরকারি ফি নয়। ফি সবসময় নির্ধারিত অনলাইন পদ্ধতিতে বা চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করুন এবং রসিদ সংগ্রহ করুন।
সময় কত লাগে: সাধারণ ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট কার্যদিবসের সময়সীমা নির্ধারিত থাকে, তবে প্রবাসী আবেদনকারী, বিরোধপূর্ণ জমি বা কাগজে ঘাটতি থাকলে সময় বেশি লাগে। ট্র্যাকিং নম্বর দিয়ে অনলাইনে অবস্থা দেখা যায়।
আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার সাধারণ কারণ
- দলিলে ও খতিয়ানে নামের বানান বা পিতার নামের অমিল।
- বায়া দলিলের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া, অর্থাৎ মাঝখানের কোনো হস্তান্তরের কাগজ না থাকা।
- একই জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা বা নিষেধাজ্ঞা থাকা।
- বিক্রেতার প্রকৃত অংশের চেয়ে বেশি জমি দলিল করা।
- জমিটি অর্পিত সম্পত্তি, খাসজমি বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট তালিকাভুক্ত হওয়া।
আবেদন নামঞ্জুর হলে আদেশের কপি সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যায়। কারণ দূর করে নতুন করে আবেদনও করা যায়। তাই নামঞ্জুরের আদেশে ঠিক কী কারণ লেখা হয়েছে, সেটি ভালোভাবে পড়ে নেওয়া সবচেয়ে জরুরি ধাপ।