Jomi Porimap BDডিজিটাল ভূমি সেবা ও পরিমাপ নির্দেশিকা

ভূমি জরিপের ইতিহাস ও খতিয়ান চেনার উপায় (CS, SA, RS ও BS খতিয়ান)

ভূমি রেকর্ড · পড়তে সময় লাগবে আনুমানিক ৯ মিনিট
লেখক: Jomi Porimap BD সম্পাদকীয় দল · প্রকাশ ও হালনাগাদ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · সম্পাদকীয় নীতি

বাংলাদেশে জমির মালিকানা প্রমাণের মূল ভিত্তি দুটি — দলিল এবং রেকর্ড। দলিল বলে জমিটি কার কাছ থেকে কার কাছে গেল, আর রেকর্ড বা খতিয়ান বলে সরকারি জরিপের সময় জমিটি কার দখলে ও নামে পাওয়া গিয়েছিল। এই দুটি কাগজ পরস্পরের সঙ্গে না মিললে মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তাই জমি কেনার আগে খতিয়ান পড়তে পারা প্রায় বাধ্যতামূলক দক্ষতা।

খতিয়ান আসলে কী

খতিয়ান হলো সরকারি জরিপের সময় তৈরি করা একটি হিসাব-বিবরণী, যেখানে একজন বা কয়েকজন মালিকের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, জমির দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি এবং প্রত্যেকের অংশের পরিমাণ লেখা থাকে। প্রতিটি মৌজার জন্য আলাদা খতিয়ান তৈরি হয়, আর প্রতিটি খতিয়ানের নিজস্ব নম্বর থাকে। খতিয়ানের সঙ্গে থাকে মৌজা নকশা, যেখানে প্রতিটি দাগের অবস্থান আঁকা।

দাগ নম্বর হলো জমির ভৌগোলিক পরিচয়পত্র। একই মৌজায় দুটি জমির দাগ নম্বর কখনো এক হয় না। তাই কেউ যখন বলে "আমার জমি ১২ শতক", সেটি অসম্পূর্ণ তথ্য — সঠিক পরিচয় হলো মৌজার নাম, জেএল নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর সহ ১২ শতক।

চারটি প্রধান জরিপ ও তাদের খতিয়ান

এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে যে জরিপগুলো হয়েছে, সেগুলোর নাম থেকেই খতিয়ানের নাম এসেছে।

CS খতিয়ান
Cadastral Survey। ব্রিটিশ আমলে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম দিকে সম্পন্ন প্রথম পূর্ণাঙ্গ জরিপ। এটিই সবচেয়ে পুরোনো ও মূল ভিত্তি রেকর্ড। জমিদারি ব্যবস্থার সময়ের হওয়ায় এতে প্রজা ও জমিদার উভয়ের তথ্য থাকে।
SA খতিয়ান
State Acquisition। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পঞ্চাশের দশকে রাষ্ট্র যখন জমিদারদের স্বত্ব অধিগ্রহণ করে, তখন তৈরি হওয়া রেকর্ড। একে অনেক জায়গায় PS বা SA/PS রেকর্ডও বলা হয়। এটি মাঠে গিয়ে নতুন করে না মেপে মূলত কাগজে-কলমে প্রস্তুত হওয়ায় এতে ভুলের হার তুলনামূলক বেশি।
RS খতিয়ান
Revisional Survey। SA রেকর্ডের ভুল সংশোধনের জন্য নতুন করে মাঠ জরিপ করে তৈরি। দেশের অধিকাংশ এলাকায় RS খতিয়ানই এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বহুল ব্যবহৃত রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
BS / BRS খতিয়ান
Bangladesh Survey, শহর এলাকায় যাকে City Survey বা মহানগর জরিপও বলা হয়। স্বাধীনতার পর শুরু হওয়া সর্বশেষ জরিপ, যা ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় সম্পন্ন হচ্ছে। যেখানে BS চূড়ান্ত প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে এটিই হালনাগাদ রেকর্ড।

কোন খতিয়ান দেখতে হবে? আপনার এলাকায় সর্বশেষ যে জরিপ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে, সেটিই মূল দেখার রেকর্ড। তবে মালিকানার ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য CS থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সব খতিয়ান মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো এক ধাপে নাম হঠাৎ বদলে গেলে বুঝতে হবে সেখানে কোনো হস্তান্তর বা ভুল হয়েছে, যার কাগজ খুঁজে বের করা জরুরি।

খতিয়ানে যে ঘরগুলো মিলিয়ে দেখবেন

  1. জেলা, উপজেলা ও মৌজার নাম এবং জেএল নম্বর: মৌজা ভুল হলে পুরো যাচাই অর্থহীন। একই নামের মৌজা পাশাপাশি উপজেলায়ও থাকতে পারে।
  2. খতিয়ান নম্বর: RS ও BS-এ আলাদা নম্বর হয়। বিক্রেতার দেওয়া নম্বর কোন জরিপের, তা স্পষ্ট করে জেনে নিন।
  3. মালিকের নাম ও পিতার নাম: বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের বানানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। নামের সামান্য অমিলও পরে নামজারিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
  4. দাগ নম্বর ও দাগের মোট জমি: একটি দাগে একাধিক মালিক থাকতে পারেন। তাই মোট জমি আর আপনার কেনা অংশ আলাদা করে বুঝতে হবে।
  5. অংশ বা হিস্যা: সাধারণত ভগ্নাংশে লেখা থাকে। দাগের মোট জমিকে এই হিস্যা দিয়ে গুণ করলে ওই মালিকের প্রকৃত জমির পরিমাণ বেরোয়।
  6. জমির শ্রেণি: নাল, ভিটি, বাড়ি, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি। শ্রেণি অনুযায়ী মৌজা রেট ও রেজিস্ট্রি খরচ আলাদা হয়, আবার কিছু শ্রেণির জমি শ্রেণি পরিবর্তন ছাড়া ব্যবহার করা যায় না।

হিস্যা থেকে প্রকৃত জমি বের করার নিয়ম

ধরুন একটি দাগে মোট জমি ৬০ শতক এবং খতিয়ানে আপনার বিক্রেতার অংশ লেখা আছে ১/৪। তাহলে তাঁর জমির পরিমাণ ৬০ ÷ ৪ = ১৫ শতক। তিনি যদি ২০ শতক বিক্রি করতে চান, তবে বুঝতে হবে হয় অন্য কোনো দাগেও তাঁর জমি আছে, নয়তো তিনি নিজের অধিকারের বাইরের জমি বিক্রি করছেন। এই সহজ হিসাবটি মিলিয়ে দেখলেই বহু প্রতারণা শুরুতেই ধরা পড়ে। প্রাপ্ত শতককে কাঠা বা বর্গফুটে রূপান্তর করতে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন।

অনলাইনে খতিয়ান যাচাই

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই খতিয়ান খোঁজা ও সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা যায়। জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং খতিয়ান নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে অনুসন্ধান করা যায়; নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করলে সার্টিফাইড কপি ডাকযোগে বা ডিজিটাল কপি হিসেবে পাওয়া যায়। প্রবাসীদের জন্য এটি বিশেষভাবে কাজের, কারণ দেশে কাউকে না পাঠিয়েই রেকর্ড মিলিয়ে দেখা সম্ভব।

তবে অনলাইনে পাওয়া তথ্যকে প্রাথমিক যাচাই হিসেবেই দেখা উচিত। কিছু এলাকার পুরোনো রেকর্ড এখনো পুরোপুরি ডিজিটাইজ হয়নি, আবার স্ক্যান করা কপিতে হাতের লেখা পড়তে ভুল হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা জেলা রেকর্ড রুম থেকে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করাই নিরাপদ।

খতিয়ানে ভুল থাকলে কী করবেন

জরিপের সময় নাম, জমির পরিমাণ বা শ্রেণিতে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জরিপ চলাকালে আপত্তি ও আপিলের নির্দিষ্ট ধাপ থাকে। চূড়ান্ত প্রকাশের পর সাধারণ কেরানিক ভুলের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করা যায়, আর মালিকানা-সংক্রান্ত বড় ধরনের ভুলের প্রতিকার নিতে হয় দেওয়ানি আদালতে রেকর্ড সংশোধনের মামলার মাধ্যমে। ভুল যত পুরোনো হয়, সংশোধন তত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয় — তাই ভুল ধরা পড়ামাত্র ব্যবস্থা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।